চট্টগ্রামের শতাব্দী প্রাচীন ঐতিহ্যের অন্যতম প্রাণবন্ত লোকউৎসব হলো বলী খেলা। শক্তি, সাহস ও কৌশলের এক অনন্য মিশেলে গড়ে ওঠা এই খেলায় বিজয়ের মূলমন্ত্র লুকিয়ে থাকে প্রতিযোগীর দৃঢ় মনোবল ও শারীরিক সামর্থ্যে।
একসময় চরাঞ্চলসহ মিরসরাইয়ের নানা গ্রাম ও জনপদে নববর্ষকে ঘিরে জাঁকজমকপূর্ণ বলী খেলার আয়োজন হতো। গ্রামীণ জনজীবনে এ ছিল উৎসবের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু সময়ের প্রবাহে সেই ঐতিহ্য অনেকটাই হারিয়ে যেতে বসেছিল, রয়ে গিয়েছিল কেবল স্মৃতির পাতায়।
তবে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও আয়োজন করা হচ্ছে এই ঐতিহ্যবাহী বলী খেলা। ফলে নতুন প্রজন্মের সামনে উন্মোচিত হচ্ছে হারিয়ে যেতে বসা এক সমৃদ্ধ সংস্কৃতি, আর পুরনো দিনের স্মৃতিও ফিরে পাচ্ছে নতুন প্রাণ।
মিরসরাই উপজেলার উপকূলীয় ইউনিয়ন ইছাখালীর চরাঞ্চলে টেকেরহাট যুব সমাজের উদ্যোগে শনিবার (৪এপ্রিল) বিকেলে পুরাতন বেড়িবাঁধ সংলগ্ন জমিতে এই বলী খেলার আয়োজন হয়। খেলা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে প্রায় ৫০ হাজার দর্শকের সমাগম ঘটে। ছোট, মাঝারি ও বড়দের বলী খেলায় শতাধিক প্রতিযোগী অংশ নেন। মিরসরাই ছাড়াও কুমিল্লা, নোয়াখালী এবং চট্টগ্রামের আব্দুল জব্বারের বলী খেলায় অংশ নেওয়া অসংখ্য বলী এতে অংশ নেন। খেলায় প্রধান আকর্ষন ছিলেন জব্বারের বলী খেলার ২০২৪ ও ২০৫ সালের চ্যাম্পিয়ন বাঘা শরীফ। খেলায় অংশগ্রহণকারীদের পুরষ্কার হিসেবে দেওয়া হয় ফ্রিজ, টিভি, বাইসাইকেল, সিলিং ফ্যান, গ্যাসের চুলা, খাঁচা ফ্যান, কলস, হটপট সহ বিভিন্ন সামগ্রী।
খেলায় অংশ নেওয়া কুমিল্লা থেকে আসা শাহজালাল বলী জানান, ‘আমি অনেক বছর ধরে বলী খেলায় অংশ নিয়ে আসছি। আমার অনেক শিষ্য দেশের বিভিন্ন প্রান্তে বলী খেলায় নিয়মিত অংশ গ্রহন করে। আজ আমি খেলায় অংশ নিয়ে বাই সাইকেল জিতলাম, ভালো লাগছে।
আরেক প্রতিযোগী বাদশা বলী বলেন, একসময় নিয়মিত বলী খেলায় অংশ নিতাম, তবে দীর্ঘদিন ধরে পেশাগত কারনে প্রবাসে থাকার কারনে খেলা মিস করেছি। এবার দেশে অবস্থান করার কারনে খেলার সুযোগ পেয়ে খুবই ভালো লাগছে।
ষাটোর্ধ্ব বলি জামাল উদ্দিন বলেন, আমি এক সময় পুরো উপজেলাজুড়ে বলি খেলায় অংশ নিয়েছি। এখন বয়সের কারণে সম্ভব হয়নি। এখন আগের মতো খেলা হয় না। কোথাও বলি খেলার হচ্ছে শুনলে ছুটে যাই। আজ টকেরহাট এসে অনেক ভালো লাগছে। হাজার হাজার মানুষের উপস্থিতিতে যেন আগের বলি খেলায় ফিরে গেলাম।
বলী খেলা আয়োজক কমিটির আহবায়ক আব্দুল্লাহ আল নোমান ও সদস্য সচিব মীর হোসেন রাহাত জানান, এ যাবতকালের সবচেয়ে বড় বলী খেলার আয়োজন ছিল এটি। গ্রামীণ ঐতিহ্যের এই খেলার আয়োজনে আমরা সম্পৃক্ত হতে পেরে ধন্য মনে করছি। ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন করার উদ্যোগ গ্রহণ করবো।তারা আরো জানান, খেলা দেখতে বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার প্রায় ৫০ হাজার দর্শকের সমাগম ঘটে। শতাধিক বলী এতে অংশ নেন।
ইছাখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মঞ্জুরুল হক মঞ্জু বলেন, ‘ইছাখালীতে ঐতিহ্যগতভাবে বলী খেলা অনুষ্ঠিত হয়ে আসছিল। বিগত কয়েক বছর বন্ধ থাকার পর আবারো শত বছরের গ্রামীণ জনপদের জনপ্রিয় এই খেলার আয়োজন করা হয়েছে।’
এসময় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন মিরসরাই উপজেলা বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব গাজী নিজামউদ্দিন, জোরারগঞ্জ ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক সদস্য সচিব মাসুকুল আলম সোহান, ইছাখালী ইউনিয়ন বিএনপির সাবেক আহবায়ক আবু নোমান, সাবেক সদস্য সচিব মনজুরুল হক মঞ্জু, সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী, যুগ্ন আহবায়ক সাব্বির হোসেন, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক সরোয়ার হোসেন রুবেল সহ নেতৃবৃন্দ।