মিরসরাইয়ের তরমুজ যাচ্ছে সারা দেশে

  • মোহাম্মদ ইউসুফ

মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের সাগর উপকূলের জমিতে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে প্রায় ২’শ একর জমিতে এখন তরমুজ খেতের সবুজ মাঠ। তরমুজ চাষের ভালো ফলনে চাষিরাও খুশি। চলতি মাস থেকে তরমুজ বিক্রি শুরু হয়েছে। পাইকার ও সৌখিন ক্রেতা খেতে এসে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন। আকার ভেদে প্রতিটি তরমুজ দুই’শ টাকা থেকে পাঁচ’শ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আবহাওয়া ভালো থাকলে প্রায় ২ কোটি টাকার তরমুজ বিক্রির সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান উদ্যোক্তারা।
জানা গেছে, মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী, মিঠানালা ও কাটাছরা ইউনিয়নের চরাঞ্চলের প্রায় ২’শ একর জমিতে চলতি বছর প্রথমবার বাণিজ্যিকভাবে তরমুজ চাষ করা হয়। উপযুক্ত আবহাওয়া ও বালি মিশ্রিত মাটি হওয়ায় এবং ইছাখালী খাল থেকে পর্যাপ্ত পানি সরবরাহের ব্যবস্থা থাকায় তরমুজের ফলনও ভালো হয়েছে। অন্যান্য বছর রবি মৌসুমে চরের অধিকাংশ জমি খালি পড়ে থাকলেও চলতি বছর এখানে তরমুজ চাষ করে চমক দেখিয়েছেন উদ্যোক্তারা। চলতি বছর পাশ^বর্তী নোয়াখালীর জেলার সুবর্ণ চর উপজেলার ১৫ জন উদ্যোক্তা মিরসরাইয়ে তরমুজ চাষের উদ্যোগ নেন। প্রথমে তারা মাটিগুলো ল্যাবে পরীক্ষা করেন। মাটি তরমুজ চাষের উপযোগী হওয়ায় গত ডিসেম্বর মাসে তারা স্থানীয় কৃষকদের থেকে ৩ মাসের জন্য প্রতি একর জমি ১৫ হাজার টাকা করে বর্গা নেন। সেই জমিতে তারা তরমুজের বীজ বপন করেন। আবহাওয়া উপযোগী হওয়ায় তরমুজ গাছে ফল ও মুকুলে চেয়ে গেছে।
তরমুজ চাষী মো. মুজাক্কির বলেন, তারা ১৫ জনের একটি দল নোয়াখালীর মাইজদী কৃষি অফিস থেকে তরমুজ চাষের প্রশিক্ষণ নেন। এরপর বিগত কয়েক বছর নিজ উপজেলা সুবর্ণচরে তরমুজ চাষ করে সফল হন। মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী, মিঠানালা ও কাটাছরা ইউনিয়নের চরের মাটি ও আবহাওয়া তরমুজ চাষের উপযোগী হওয়ায় তারা এখানে বাণিজ্যিকভাবে চাষের উদ্যোগ নেন। পরবর্তীতে স্থানীয় কৃষকদের থেকে জমি বর্গা নিয়ে চীন, আমেরিকা ও বাংলাদেশী ৮ প্রজাতির তরমুজ চাষ করেন। প্রায় ২’শ একর জমিতে তাদের অধীনে প্রায় শতাধিক শ্রমিক কাজ করছেন।
তিনি আরো বলেন, মিরসরাইতে প্রথমবার তরমুজ চাষ করে সফলতা পাওয়া গেছে। চলতি মাসের শুরু থেকে প্রতিদিন ৪-৫টি বড় ট্রাকে করে তরমুজ ঢাকা, চট্টগ্রাম, ফেনী, সাতকানিয়া, চকরিয়া সহ বিভিন্ন পাইকারী আড়তে পাঠানো হচ্ছে। আকার ভেদে ৪ গ্রেডে তরমুজ বিক্রি করা হচ্ছে। ২’শ টাকা থেকে ৫’শ টাকায় তরমুজ বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক সৌখিন ক্রেতা খেত থেকে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন বলে তিনি জানান।
নোয়াখালী জেলার সুবর্ণচর তোতারবাজার চর ভাটা গ্রামের সিরাজুল ইসলাম জানান, ১২ বছর ধরে বিভিন্ন উপজেলায় তিন মাসি ফসল তরমুজ চাষ করছেন। প্রথম যাত্রা শুরু করেন সুবর্ণচর থেকে। এরপর দুই বছর সোনাগাজী চাষ করেন। এবার প্রথম বাণিজ্যিকভাবে মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী এলাকায় চাষ করেছেন। তারা তিন মাসের জন্য বিভিন্ন মালিক থেকে জমি ইজারা নেন। ৯০ দিনের মধ্যে ফসল বিক্রি শেষ হলে জমির মালিককে জমি বুঝিয়ে দেন। আবার পরের বছর নতুন করে লিজ নিয়ে চাষ করেন। এখানের আবহাওয়া তরমুজ চাষের উপযোগী। আশা করা হচ্ছে ফলনও ভালো হবে। এপ্রিল মাসের শুরু থেকে তরমুজ তোলা শুরু হয়েছে। প্রায় ১ লাখ পিছ তরমুজ বিক্রি করা হবে বলে জানান তিনি।
সম্প্রতি পূর্ব ইছাখালি গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবুজ লতার সমারোহ। তরমুজ গাছ ফল আরও মুকুলে সয়লাব। শ্রমিকরা বড় সাইজের তরমুজ বিক্রির জন্য এক জায়গায় একত্র করছেন। কেউ আবার সেগুলো গাড়িতে তুলে দিচ্ছেন। খেত থেকে তরমুজ কেনার জন্য মিরসরাই উপজেলা সহ বিভিন্ন জায়গা থেকে সৌখিন ক্রেতারা এসে ভীড় করেছেন। পছন্দের সহিত দরদাম করে তরমুজ কিনে নিয়ে যাচ্ছেন।
ইছাখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল মোস্তফা বলেন, ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে খালি জমি পড়ে থাকত। এ বছর সুবর্ণচর এলাকার কয়েকজন উদ্যোক্তা সেই জমিতে তরমুজ চাষ করে সাড়া ফেলে দিয়েছেন। আগামী বছর থেকে ব্যাপকভাবে তরমুজ চাষ করা সম্ভব। প্রশিক্ষণ পেলে মিরসরাইয়ের বিভিন্ন গ্রামে তরমুজ চাষ করা সম্ভব হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রঘুনাথ নাহা বলেন, মিরসরাইয়ে প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক ভাবে তরমুজ চাষ করা হয়েছে। আমি তরমুজ ক্ষেত পরিদর্শন করে এসেছি। ক্ষেতে জৈব সার ব্যবহার ও রোগ প্রতিরোধের জন্য চাষীদের বিভিন্ন পরামর্শ দিয়েছি। আবহাওয়া উপযোগী থাকলে ভালো ফলন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তরমুজ চাষে পরিশ্রম বেশী হলেও অন্যান্য রবিশষ্য থেকে এটাতে ৩ গুণ বেশী লাভ হয়।

আরো খবর