ট্রেনে কাটা পড়ে ও দুর্ঘটনায় দীর্ঘ হচ্ছে লাশের সারি

পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের ৩০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে ট্রেনে কাটা পড়ে ও দুর্ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে চলছে। দীর্ঘ হচ্ছে লাশের মিছিল। মানুষের অসতর্কতা, লেভেল ক্রসিংয়ে গেটকিপারদের দায়িত্বে অবহেলা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ। সর্বশেষ গত ১ আগষ্ট দুপুরে মিরসরাই রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকায় মহানগর প্রভাতী এক্সপ্রেসের ধাক্কায় মো. মামুন মিয়া নামে এক সিএনজি চালক নিহত হয়েছে। এর আগে ২৯ জুলাই খৈয়াছড়া ঝরণা এলাকার লেভেলক্রসিংয়ে মহানগর প্রভাতী এক্সপ্রেসের ধাক্কায় মাইক্রোবাসে থাকা চালক সহ ১১ পর্যটক ঘটনাস্থলে নিহত হয়। একই ঘটনায় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছে আরো দুইজন। তারা সকলের চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার চিকনদন্ডী ইউনিয়নের আমানবাজার এলাকার বাসিন্দা। সবাই একটি কোচিং সেন্টারের ছাত্র ও শিক্ষক। মূলত গেটকিপার সাদ্দামের দায়িত্বে অবহেলার কারণে এমন মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটেছে।

খবর নিয়ে জানা গেছে, এই অঞ্চলে ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত ও আহতের সংখ্যা ক্রমশ দীর্ঘ হচ্ছে। রেললাইন পার হওয়ার সময়, কেউ সেলফি তুলতে গিয়ে, কেউ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন দিয়ে হাঁটার সময়, কেউ হেডফোনে গান শুনতে শুনতে অসতর্কতাবশতঃ হাঁটতে গিয়ে, ঘনবসতি এলাকা দিয়ে ট্রেন চলাচলের সময় ট্রেনের হুইসেল শুনতে না পাওয়া, রেললাইন ঘেঁেস বাজার বসানো, নেশাগ্রস্থ হয়ে রেললাইনে চলাচল, আঁকাবাঁকা পথে ট্রেন দেখতে না পাওয়া, ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা, মানসকি রোগী, কেউ জেনে-শুনে আত্মহত্যা করার কারণে ট্রেনে কাটা পড়া ও দুর্ঘটনার কারণগুলো বেরিয়ে এসেছে।

বিভিন্ন হাসপাতাল, গনমাধ্যম, রেলওয়ে পুলিশ, রেল ষ্টেশন মাষ্টার সহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, পূর্বাঞ্চল রেলের মিরসরাই এর ৩০ কিলোমিটার অংশে ট্রেনে কাটা পড়ে ও দুর্ঘটনায় গত ১০ বছরে প্রায় শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছে। তারমধ্যে বারইয়ারহাট লেভেল ক্রসিংয়ে মারা গেছে ৩০ জনের বেশি মানুষ।

বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, প্রতি বছর পূর্বাঞ্চল রেলে কাটা পড়ে মারা যাচ্ছে বহু মানুষ। এ জন্য পথচারী ও বিভিন্ন যানবাহনের চালকরা অরক্ষিত লেভেল ক্রসিংয়ের পাশাপাশি কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাকে দায়ী করছেন। অবশ্য ক্রসিংগুলোর গেটকিপারদের দাবি, সিগন্যাল অমান্য করে তাড়াহুড়ো করে পারাপারের সময়ও দুর্ঘটনা ঘটছে।

জানা গেছে, ২০২২ সালের ৫ জুলাই সকাল ১০টায় উপজেলার মস্তাননগর এলাকায় এসএসসি পরীক্ষার্থী সাজ্জাদ হোসেন ইমন নামে এক শিক্ষার্থী ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়। ২০২২ সালের ১৮ জুন দুপুরে বড়তাকিয়া এলাকায় অজ্ঞাত ৪০ বছর বয়সী এক পুরুষ নিহত এবং এক কিশোর আহত হয়েছে। ২৪ জুন খৈয়াছরা ঝরনা রোড় এলাকায় এনজিও কর্মী সত্য নারায়ণ পাল ট্রেনের নিচে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন। তার বাড়ি নোয়াখালী জেলার কবিরহাট থানার পশ্চিম দরদনগর এলাকায়। ২৫ এপ্রিল মিরসরাই রেলওয়ে ষ্টেশন এলাকায় পারভীন আক্তার নামের মহিলা ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হয়। তার বাড়ী মিরসরাই পৌরসভার তারাকাটিয়া এলাকায়। ২০২১ সালের ১৮ অক্টোবর নিজামপুর এলাকায় রেললাইন পার হওয়ার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে কবিতা রানী বড়–য়া নামে এক মহিলার মৃত্যু হয়। সে উপজেলার হাইতকান্দি ইউনিয়নের দানীশ বড়–য়ার স্ত্রী। ২০২০ সালের ৪ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় বাওয়াছড়া পর্যটন স্পট ঘুরে রেল লাইনে এসে সেলফী তোলার সময় ট্রেনে কাটা পড়ে আব্দুল মালেক ও সুমাইয়া আক্তার নামে ভাই-বোনের মৃত্যু হয়। তারা ওই এলাকার মো. মোস্তফার ছেলে-মেয়ে। ২০২০ সালের ২১ ডিসেম্বর ওয়াহেদপুর ইউনিয়নের উত্তর ওয়াহেদপুর এলাকায় ট্রেনে কাটা পড়ে মির্জা বাজার ইসলামীয়া মাদরাসার ৮ম শ্রেণীর শিক্ষার্থী নাজমুল ইসলাম ফয়সাল নামের এক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হয়েছে। ২০২০ সালের ১২ জানুয়ারি বারইয়ারহাট লেভেল ক্রসিং এলাকায় সন্ধ্যা ৭ টায় ট্রেনে কাটা পড়ে সাবেক স্কুল শিক্ষক সালামত উল্লাহ নিহত হয়েছেন। তার বাড়ী ধুম ইউনিয়নের মোবারকঘোনা এলাকায়। ২০২০ সালের ১১ সেপ্টেম্বর মিরসরাই উপজেলার মহামায়া এলাকায় অজ্ঞাত এক যুবক ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যায়। ২০১৯ সালের ৬ জানুয়ারি বারইয়ারহাট লেভেল ক্রসিং এলাকায় সকালে খাগড়াছড়ির আব্দুল রফিক ট্রেনে কাটা পড়ে নিহত হন। ২০১৮ সালের ১২ জুলাই বারইয়ারহাট এলাকায় ডাক্তার দেখানো শেষে বাড়ি যাওয়ার পথে রেহেনা আক্তার নামে এক মহিলার মৃত্যু হয়। তার বাড়ি উপজেলার করেরহাট ইউনিয়নের ঘেড়ামারা এলাকায়। ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর বারইয়ারহাটে ট্রেনে কাটা পড়ে আকবর হোসেন নামে এক যুবক মারা যায়। আকবর হোসেন উপজেলার মিঠাছড়া বাজারের ফার্নিচার ব্যবসায়ি ছিলো। ২০১৫ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ওয়াহেদপুরে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান আনসার সদস্য আবু বকর।

এছাড়া বড়তাকিয়া রেলওয়ে এলাকায় এক পুরুষ, মিরসরাই ষ্টেশনের উত্তর পাশ্বে এক মহিলা, চিনকী আস্তানা ষ্টেশন এলাকায় এক পুরুষ, বড়তাকিয়া খৈয়াছড়া গেইটের উত্তরে এক মহিলা, বারইয়ারহাট লেভেল ক্রসিং এর আগে এক পুরুষ, বারইয়ারহাটে ড্রাম ট্রাক ও ট্রেনের ধাক্কায় এক পুরুষ, বারইয়ারহাটে এক পুরুষ, বড়তাকিয়া খৈয়াছড়া গেইটে এক পুরুষ, বারইয়ারহাট ধুমঘাট ব্রীজ এলাকায় এক মহিলা ট্রেনে কাট পড়ে মারা গেছে। তাদের পরিচয় পাওয়া যায়নি।

জানা যায়, ১৮৯০ সালের রেল আইনে রেললাইনের দুই পাশে ১০ ফুটের মধ্যে মানুষের চলাচল নিষিদ্ধ। এমনকি এর মধ্যে গরু-ছাগল সহ কোন প্রাণি ঢুকে পড়লে সেটিকেও নিলামে বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে রেল কর্তৃপক্ষের। রেলে কাটা পড়লে কেউ আহত হলে উল্টো ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধেই মামলা করতে পারে রেলওয়ে।

এই অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা সীতাকুন্ড রেলওয়ে পুলিশ (জিআরপি) ফাঁড়ির ইনচার্জ খোরশেদ আলম বলেন, আমি ২০২১ সালের নভেম্বর থেকে এখানে ইনচার্জের দায়িত্ব পালন করে আসছি। এই অঞ্চলে প্রায় সময় ট্রেনে কাটা পড়ে মানুষ মারা যায়। আমরা খবর পেলে লাশ উদ্ধার করে নিয়ে আসি। অনেক সময় আমাদের কাছে খবর পৌছার আগে স্বজনরা লাশ নিয়ে যায়। এছাড়া কয়েকটি ট্রেন দুর্ঘটনায়ও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ গত ২৯ জুলাই খৈয়াছড়া ঝরনা লেভেল ক্রসিংয়ে একসাথে ১৩ জন মারা গেছেন।

চিনকী আস্তানা রেল ষ্টেশন মাষ্টার মো. সিরাজুল ইসলাম বলেন, আমার দায়িত্বের এলাকার মধ্যে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার সঠিক হিসেব বলতে পারবো না। আমাদের দায়িত্ব ট্রেনের ট্রাফিক সিগন্যালের। এগুলো হিসেব থাকে জিআরপি পুলিশের কাছে। ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাওয়ার কারণ হিসেবে তিনি বলেন, কেউ মোবাইল ফোনে কথা বলতে বলতে রেললাইন দিয়ে হাঁটে, কেউ হেডফোনে গান শুনতে শুনতে অসতর্কতাবশতঃ হাঁটতে গিয়ে, নেশাগ্রস্থ হয়ে রেললাইনে চলাচল, ঝুঁকি নিয়ে ট্রেনের ছাদে ভ্রমণ করা ইত্যাদি। তবে ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যাওয়া বেশির ভাগ মানুষ অসচেতন, পাগল ও ভবঘুরে।

আরো খবর