করোনায় ম্লান ঈদ আনন্দ

\মোহাম্মদ ইউসুফ

মহামারী করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে চলমান ‘সর্বাত্মক লকডাউন’ এর বিধিনিষেধ এর কারণে কর্মহীন হয়ে পড়েছে নিম্ন ও মধ্য আয়ের মানুষ। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও নেই আগের মতো বিকিকিনি। এতে করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবাগুলো চরম অর্থনৈতিক সংকটে থাকায় আসন্ন পবিত্র ঈদুল ফিতর এর ঈদ আনন্দ তাদের কাছে ম্লান হয়ে গেছে। ঈদে বাঙ্গালীর চিরচায়িত সংস্কৃতি নতুন জামা কেনার দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য যেন হারিয়ে যেতে বসেছে। এদিকে সারা দেশের ন্যায় মিরসরাইতেও বাড়তেছে করোনা সংক্রমণ। সরকারের ঘোষিত স্বাস্থ্যবিধি সহ বিধি নিষেধগুলো মানছে না অনেকে।

জানা গেছে, গত বছর করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে সাধারণ ছুটিতে সরকারি ও বেসরকারি ভাবে বিভিন্ন ইউনিয়নে ত্রাণ ও নগদ অর্থ সহায়তা দেওয়া হয়; কিন্তু এ বছর পুরোটা তার ব্যতিক্রম। উপজেলার কয়েকটি ইউনিয়ন ছাড়া বাকী ইউনিয়নগুলোতেও এবছর বেসরকারি উদ্যোগে ত্রাণ দেওয়ার চিত্র তেমন চোখে পড়েনি। এতে করে চলমান ‘লকডাউন’ এর বিধিনিষেধের কারণে কর্মহীন হওয়া গণপরিবহণের শ্রমিক, দিনমজুর, নিম্নবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো পড়েছে চরম বেকাদায়। পরিবার পরিজন নিয়ে অসহায় জীবন পার করছে পরিবারগুলো। বৈশ্বিক করোনা মহামারির দারুণ প্রভাব পড়েছে মিরসরাইয়ের ঈদ বাজারে। ঈদকে সামনে রেখে উপজেলার বিপণিবিতানের দোকানে দোকানে নানা বাহারি পোশাক তুলেছেন মালিকরা। নানা রকমের পোশাক ঝুলিয়ে সাজিয়ে তুলেছেন দোকান। কিন্তু ঈদের আর অল্প কয়েকদিন বাকি থাকলেও আশানুরূপ ক্রেতা না থাকায় হতাশ ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা বলছেন, গণপরিবহন না চলার কারণে ক্রেতারা আসতে পারছেন না। ফলে বেচাকেনা কম। বিকিকিনি না বাড়লে ব্যবসায় লোকসান গুনতে হবে। বেচাকেনা যতটুকু হচ্ছে সেটি আশানুরূপ নয় বলে জানিয়েছেন বিক্রেতারা। ক্রেতার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুনছেন ব্যবসায়ীরা।

এদিকে উপজেলার বারইয়ারহাট পৌরবাজার, জোরারগঞ্জ, মিঠাছড়া, মিরসরাই সদর, হাদিফকিরহাট, বড়দারোগার হাট ঘুরে দেখা গেছে, সরকারি নির্দেশনা মেনে সকাল ১০টা থেকে রাত ৮টা পযন্ত মার্কেটগুলো খুলছেন ব্যবসায়ীরা। অন্যান্য বছরের মতো এবার দু-একটি মার্কেট ছাড়া প্রায় মার্কেটে নেই কোনো আলোকসজ্জা। ব্যবসায়ীরা জানান, ঈদ সামনে রেখে ওয়াকা, সাকিরা, তেরেনাম, সোহানা, কোটালি, আধুরি, বিদায় সাজনা, বেহেনা, চায়না প্রিন্ট, মাসাককালি, নেট শাড়ি, জামদানি, কাতান শাড়ি দোকানে তুলেছেন।
মিঠাছরা আল আমিন ক্লাথ ষ্টোরের পরিচালত মো. শরিফ উদ্দিন বলেন, ঈদকে সামনে রেখে নিত্য নতুন ডিজাইনের পোশাক ও কাপড় দোকানে তুলেছেন। অন্যান্য বছরের ঈদের চেয়ে এ বছর বেচাকেনা কম। আগে অনেক দূর থেকেও তাদের ক্রেতা আসতেন। এবার গণপরিবহন না থাকার কারণে দূরের ক্রেতা তেমন নেই। এলাকাভিত্তিক ক্রেতা আসছেন বলে জানান তিনি।

মিরসরাই সদরের কাশেম শপিং মার্কেটের মাওলা ফ্যাশনের স্বত্বাধিকারী মুজাহিদ ইসলাম সেলিম জানান, বেচাকেনা নেই বললেই চলে। প্রত্যেক দোকানদার বিক্রির জন্য পর্যাপ্ত কাপড় মজুদ করলেও আগের মতো বেচাকেনা হচ্ছে না। তার মতে, মানুষের হাতে পর্যাপ্ত টাকা না থাকার কারণে এবারের ঈদবাজার জমে উঠছে না।

মিঠাছরা বাজারের মুদি দোকানের ব্যবসায়ী মো. জাফর উদ্দিন বলেন, করোনা ভাইরাসের কারণে আর্থিক কষ্টে আছেন নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। অন্যান্য বছর রমজানে যে পরিমাণ সেমাই, চিনি সহ ঈদ সামগ্রী বিক্রি করতাম এ বছর তেমন বিক্রি হচ্ছে না।
বারইয়ারহাট লাকী ফ্যাশন মলের স্বত্বাধিকারী মো. শামসুদ্দিন বলেন, ‘ব্যবসায় এমন খারাপ অবস্থা এর আগে দেখা যায়নি। এরপরও আশা করছি সামনের দিনগুলোতে বেচাকেনা বাড়তে পারে।’

মিরসরাই সদরে বাচ্চাদের জন্য পোশাক কিনতে আসা রেজাউল করিম নামে এ ক্রেতা বলেন, ‘ঈদ উপলক্ষে বাচ্চাদের জন্য কিছু কেনাকাটা করতে আসছি। করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকট রয়েছে। তবু বাচ্চাদের বায়না মেনে কিছু কিনতে হচ্ছে।’

ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের বারইয়ারহাট-বড়দারোগারহাট রুটে চলাচলকারী সেইফ লাইনের চালক মো. রিপন বলেন, লকডাউনের কারণে গত ১ মাস যাবৎ গাড়ী চালাতে পারছিনা। গত বছর রাজনৈতিক নেতা ও বিভিন্ন সংগঠন আমাদের খাদ্য সহায়তা দিলেও এবছর এখন পর্যন্ত কেউ খবর নেয়নি। কর্মহীন হয়ে যাওয়ায় পরিবার নিয়ে চরম কষ্টে দিনপার করছি। এরমধ্যে এসেছে ঈদ। টাকা না থাকায় ঠিকমতো পেট ভরে খেতে পারছিনা। ঈদে নিজে কিছু না কিনলেও ছেলে মেয়েদের নতুন জামা কিনে দিতে হবে। এখন কি করবো ভেবে পাচ্ছি না।
বেসরকারি একটি কিন্ডারগার্ডেনে শিক্ষকতার পেশায় কর্মরত ছিলেন মো. আবদুল্লাহ।

পরিবারের আর্থিক স্বচ্ছলতার জন্য শিক্ষকতার পাশাপাশি কয়েকটি টিউশানি করে পরিবার চালাতেন। এতে করে মা-বাবা আর ছোট ভাইকে নিয়ে তার পরিবার ভালোই চলতো। করোনা ভাইরাসের কারণে গত বছর থেকে দেশের অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ন্যায় বন্ধ রয়েছে কিন্ডারগার্ডেন প্রতিষ্ঠানগুলোও। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করার পর প্রতিষ্ঠানের মালিক পক্ষ থেকে আরা যোগাযোগ করেনি শিক্ষকদের সাথে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ হওয়ার পর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে টিউশানিও। এতে করে বেকার জীবন পার করছেন তিনি। আসন্ন ঈদে পরিবারের সদস্যদের জন্য নতুন জামা কেনার জন্য তার কাছে নেই কোন টাকা। করোনা ভাইরাসের কারণে বেকার হয়ে যাওয়া আবদুল্লাহ’র মতো এমন অনেকে আত্মসম্মানের ভয়ে অন্যের কাছে হাত পাততে পারছেন না। পরিবার-পরিজন নিয়ে চরম হতাশায় তারা দিনাতিপাত করছেন।

এদিকে মিরসরাইতে ৫ মে পর্যন্ত ৪’শ ৪৪ জন করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছে। মারা গেছে ৫ জন। উপজেলায় করোনা ভ্যাকসিনের জন্য রেজিষ্ট্রেশন করেছে ১৯ হাজার ৮’শ জন। প্রথম ডোজ টিকা গ্রহণ করেছে ১৬ হাজার ৪’শ ৫১ জন। দ্বিতীয় ডোজ টিকা গ্রহণ করেছে ১১ হাজার ৬’শ ৯৫ জন। উপজেলাতে মোট ৩ হাজার ১’শ ৪০ ভায়েল ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে। এদিকে করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ‘লকডাউন’ এর জন্য বিভিন্ন বিধিনিষেধ আরোপ করা হলেও মিরসরাইতে তা চলছে ঢিমেতালে। হাটবাজার, শপিং মলে ক্রেতা-বিক্রেতারা মানছেন না স্বাস্থ্যবিধি ও সামাজিক দুরত্ব। এতে করে বাড়তেছে করোনা সংক্রমণ। বড় বিপণিবিতান ও দোকানগুলোতে করোনা প্রতিরোধে জীবানুনাশক স্প্রে করার ব্যবস্থা থাকলেও ছোটখাটো দোকানগুলোতে তা নেই।

উপজেলা চেয়ারম্যান মো. জসিম উদ্দিন বলেন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রালয়ের অধীনে করোনাকালীন সময়ে কর্মক্ষম হওয়া বেকার, অসহায়, গরীব ও দুঃস্থদের মাঝে প্রধানমন্ত্রীর ঈদ উপহার হিসেবে উপজেলার ৮ হাজার ৭’শ জনকে নগদ ৫’শ টাকা করে সহায়তা প্রধান করা হয়েছে। এছাড়া আওয়ামীলীগ ও বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক সংগঠনের উদ্যোগে বিভিন্ন ইউনিয়নে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। আগামীতে সরকারি বরাদ্ধ আসলে তা অসহায়, দুঃস্থ ও কর্মহীন মানুষদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দেওয়া হবে বলে জানান এ জনপ্রতিনিধি।

আরো খবর