ঈদুল আজহা ও কুরবানী

আলহাজ্ব মাওলানা আবদুল মােমেন নাছেরী

ঈদুল আজহার দিন সকালে জামা’আতের সাথে ঈদের দুই রাকআত নামায পড়া প্রত্যেক সুস্থ মপ্তিষ্ক সম্পন্ন পুরুষের উপর ওয়াজিব। মেয়েদের উপর ঈদের নামায নেই।।
ঈদের নামায পড়ার নিয়ম : প্রথমে কান বরাবর উভয় হাত তুলবেন। তারপর এভাবে নিয়ত করিবেন “আমি ঈদুল আযাহার দুই রাক’আত ওয়াজিব নামায এই ইমামের পিছনে পড়ছি।” অতপর তাকবীরে তাহরীমা বলে হাত নাভীর নিচে বাঁধবেন এবং ছানা পড়বেন। তারপর আররো তিনবার তাকবির বলবেন এবং প্রথম দুই তাকবীরে হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে ছেড়ে দিবেন। এরপর ৩য় বার হাত কান পর্যন্ত তুলে আল্লাহু আকবর বলে হাত বেধে চুপ করে ইমামের কিরাআত শ্রবণ করবেন।

এভাবে প্রথম রাক আত আদায়ের পর দ্বিতীয় রাকাতের কিরাতের পর তিন বার হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে প্রত্যেক তাকবীর বলে প্রত্যেক বার হাত ছেড়ে দিবেন এরপর তৃতীয় বার হাত কান পর্যন্ত তুলে “আল্লাহু আকবার বলে চুপ করে ইমামের কিরাত শ্রবন করবেন। এভাবে প্রথম রাকাত। আদাযের পর দ্বিতীয় রাকআত আদায়ের পর তিনবার হাত কান পর্যন্ত উঠিয়ে প্রত্যেকবার তাকবীর বলে হাত ছেড়ে দিবে। এরপর চতুর্থ বার হাত না তুলে আল্লাহু আকবর বলে রুকুতে যাবেন। এবং অবশিষ্ট নামায অন্যান্য নামাযের ন্যায় সম্পন্ন করবেন। (ফাতাওয়া শামী, ১ম খন্ড, ১৭২ পৃষ্ঠা)

কুরবানীর আহকাম

কুরবানী একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। এটি আদায় করা ওয়াজিব। এ সম্পর্কে হযরত মিখনাফ ইবনে সুলাইম (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন, আমরা আরাফাহ ময়দানে রাসূলুল-হ (সা.) এর সাথে বসা ছিলাম। তখন ইরশাদ করতে শুনেছি , “হে লােক সকল! নিশ্চয় প্রত্যেক পরিবারের উপর প্রত্যেক বছর কুরবানী দেওয়া অপরিহার্য ”
(সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩১২৫)
তেমনি হযরত আবু হুরাইরা (রা) হতে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুলাহি (সা) ইরশাদ করেন-“যার কুরবানীর সামর্থ রয়েছে, কিন্তু কুরবানী করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের নিকটে না আসে।
(মুস্তাদরাকে হাকিম, হাদীস নং ৩৫১৯)
কুরবানী সহীহ-শুদ্ধভাবে আদায় করা কর্তব্য। এখানে কুরবানীর কিছু জরুরী মাসায়িল উল্লেখ হল-
প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থমস্তিষ্ক সম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর যে ১০ যিলহজ্ব ফজর থেকে ১২ জিলহজ্ব সূযার্স্ত পর্যন্ত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক থাকবেন, তার উপর কুরবানী করা ওয়াজীব।

নিসাব হলো, স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত ভরি, রূপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ন্ন ভরি এবং টাকা-পয়সা, সোনা-রূপা, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে না এমন জমি, প্রয়োজন অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় সকল আসবাবপত্র কুরবানীর নিসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য।

সোনা বা রূপা কিংবা টাকা-পয়সা এগুলোর কোন একটি যদি পৃথকভাবে নিসাব পরিমান না থাকে, কিন্তু সবকিছু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা মূল্যের সমপরিমাণ হয়ে যায়, তাহলেও তার উপর কুরবানী করা ওয়াজীব হবে। (ফাতওয়া তাতারখানিয়া, ১৭ খন্ড, ৪০৫ পৃষ্ঠা)
কুরবানীর ওয়াজীব হওয়ার জন্য নিসাব পুরো বছর থাকা জরুরী নয়; বরং কুরবানীর তিনদের মধ্যে যে কোন দিন থাকলেই কুরবানী ওয়াজীব হবে।
মোট তিন দিন কুরবানী করা যায়। যিলহজ্বের ১০,১১,১২ তারিখ সূর্যাস্ত পর্যন্ত। তবে সম্ভব হলে যিলহজ্বের ১০ তারিখেই কুরবানী করা উত্তম।

নাবালেগ-শিশু-কিশোর তদ্রæপ যে সুস্থমস্তিষ্ক নয়, তারা নিসাবের মালিক হলেও তাদের উপর কুরবানী ওয়াজীব নয়। অবশ্য তাদের অভিভাবক নিজেদের সম্পদ দ্বারা তাদের পক্ষে কুরবানী করা তার উপর ওয়াজীব হয়ে যায়।
দরিদ্র ব্যক্তির উপর কুরবানী করা ওয়াজীব, কিন্তু কোনাে দরিদ্র ব্যক্তি যদি কুরবানীর নিয়তে কোনো পশু কিনেন তাহলে তা কুরবানি করা তার উপর ওয়াজীব হয়ে যায়।
কেউ যদি কুরবানীর দিনগুলােতে ওয়াজীব কুরবানী দিতে না পারেন, তাহলে কুরবানীর পশু ক্রয় না করে থাকলে তার উপর কুরবানীর উপযুক্ত একটি ছাগলের মূল্য সদকা করা
ওয়াজীব হবে। আর যদি পশু ক্রয় করে ছিলেন, কিন্তু কোনো কারণে কুরবানী দেওয়া হয়নি, তাহলে ঐ পশু জীবিত সদকা করে দিবেন।

৫ প্রকার পশু (নর ও মাদী) দ্বারা কুরবানী করা যাবেঃ উট, গররুমহিষ, ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা। উট কমপক্ষে ৫ বছর, গরু কমপক্ষে ২ বছর আর ছাগল, ভেড়া ও দুম্বা কমপক্ষে ১ বছরের হতে হবে। তবে ভেড়া ও দুম্বা যদি একবছর এর কিছু কম হয়, কিন্তু এমন হৃষ্টপুষ্ট যে , দেখতে এক বছরের মতাে মনে হয়, তাহলে তা দ্বারা কুরবানী জায়েয। অবশ্য এ ক্ষেত্রে কমপক্ষে ৬ মাস বয়সের হতে হবে। কিন্তু ছাগলের বয়স ১ বছরের কম হলে কোনো অবস্থাতেই তা দ্বারা কুরবানী জায়েয হবে না।

যে পশুর একটি পা নষ্ট হয়ে গেছে, ফলে চলার সময় সেটা দ্বারা সাহায্য নিতে পারে না, তা দ্বারা কুরবানী সহীহ হবে না। শিং-এর গোড়া দিয়ে ভেঙ্গে যদি মগজে ক্ষতি পৌছে , তাহলে কুরবানী হবে না। দাঁত মোটেও না উঠলে অথবা অর্ধেকের বেশি পড়ে গেলে, তা দ্বারা কুরবানী হবে না। কান বা লেজের তিনভাগের একভাগ-এর বেশী কাটা গেলে তা দ্বারা কুরবানী হবে না।

একটি ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা দ্বারা শুধু একজনই কুরবানী দিতে পারবেন। কয়েকজন মিলে কুরবানী করলে কারোরটাই সহীহ হবে না। আর উট, গরু ও মহিষের সর্বোচ্চ সাত জন শরীক হতে পারবেন। সাতের অধিক হলে কারাে কুরবানী সহীহ হবে না। আবার কারাে অংশ এক সপ্তমাংশের
অনুপাতের কম হতে পারবে না। যেমন কারাে আধা ভাগ, কারো আধা ভাগ, কারো দেড় ভাগ। এমন হলে কোনো শরীকের কুরবানীই সহীহ হবে না।
কুরবানীর গরু , মহিষ ও উটে আকীকার নিয়তে শরীক হতে পারবে। এতে কুরবানী ও আকীকা দুটোই সহীহ হবে।

কুরবানীর পশু নিজে জবাই করা উত্তম। নিজে না পারলে অন্যকে দিয়েও জবাই করাতে পারবেন। এক্ষেত্রে কুরবানী দাতা পুরুষ হলে উপস্থিত থাকা ভালো।

অনেকসময় জবাইকারীর জবাই সম্পন্ন হয় না, তখন কসাই বা অন্য কেউ জবাই সম্পন্ন করে থাকে। এক্ষেত্রে অবশ্যই উভয়কে নিজ নিজ যবাইয়ের আগে -বিসমিল্লাহি আল্লাহ আকবার পড়তে হবে। যদি একজন না পড়েন তবে ওই কুরবানী সহীহ হবে না।

শরীকে কুরবানী করলে ওজন করে সমভাবে গোশত বন্টন করতে হবে। অনুমান করে বা বেশকম করে ভাগ করা জায়িয নয়।

কুরবানীর গোশতের এক তৃতীয়াংশ গরীব-মিসকিনকে, এক তৃতীয়াংশ আতœীয়-স্বজনপাড়া প্রতিবেশীকে এবং এক তৃতীয়াংশ নিজেরা খাওয়া উত্তম। অবশ্য জরুরতের কারণে পুরো গোশত যদি নিজে রেখে দেয়, তাতেও কোন গুনাহ হবে না।
কুরবানীর গোশত, চর্বি ইত্যাদি বিক্রি করা জায়িয নয়। বিক্রি করলে পূর্ণ মূল্য সদকা দিতে হবে।

পরিশেষে- আল্লাহ তায়ালা আমাদের কে সহীহ শুদ্ধভাবে কুরবানী আদায় করার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করার তৌফিক দান করুন।

লেখক: বিশিষ্ট ইসলামিক চিন্তাবিদ মোফাচ্ছিরে কোরআন মিডিয়া ব্যক্তিত্ব ও বহু গ্রন্থ প্রনেতা। পীর সাহেব, মিরসরাই, চট্টগ্রাম।

আরো খবর